উৎপাদনমুখী ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ে প্রধান ঝুঁকি কি কি?

ব্যবসায়িক ঝুঁকি

আমদানি-রপ্তানি এবং উৎপাদনমুখী ব্যবসায় বিশ্বজুড়ে  একটি লাভজনক ব্যবসায়। একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এ দুই ধরনের ব্যবসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে বিষয়টি কোনভাবেই  এড়িয়ে যাওয়া যায় না তা হলো, এই ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নানা রকম ঝুঁকি রয়েছে। নিম্নে উৎপাদনমুখী, আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসায়ের প্রধান ব্যবসায়িক ঝুঁকি গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।

উৎপাদনমুখী ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ে প্রধান ঝুঁকিসমূহ

উৎপাদনমুখী ব্যবসা ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ে যেসব প্রধান ব্যবসায়িক ঝুঁকি সমুহ সমগ্র ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে তা নিম্নে দেয়া হল।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া

উৎপাদনমুখী ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ের প্রধান ঝুঁকি গুলোর মধ্যে প্রথম ও অন্যতম হলো উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। এই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ারও আবার নানাবিধ কারণ রয়েছে।

কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাওয়া

আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসার প্রধান ঝুঁকি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম যে কারণটি থাকতে পারে তা হলো কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাওয়া। নানান সময় দেখা যায় যে পণ্য আমদানি অথবা রপ্তানি করা হবে তার জন্য যেই কাঁচামাল প্রয়োজন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে সেই কাঁচামালের মূল্য বেশি। কখনো কখনো একটি কাঁচামালের চাহিদা বেশি থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়। একটি পণ্য তৈরি করার পূর্বে তার কাঁচামালের দামই  যদি থাকে বেশি, স্বাভাবিকভাবেই ফিনিশড যেই পণ্য তার দাম বাড়তি হয়ে যায়। আর বাড়তি দামের আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসায় পড়ে ঝুঁকের মুখে।

লেবার খরচ  বেড়ে যাওয়া

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পিছনে আরেকটি কারণ হিসেবে কাজ করে লেবার খরচ বেড়ে যাওয়া। কোন কারনে একটি রপ্তানি বা আমদানি যোগ্য পণ্যের উৎপাদন ক্ষেত্রে যদি লেবার কস্টিং বেশি হয় সেই ক্ষেত্রেও কিন্তু পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। ফলস্বরূপ রপ্তানির ক্ষেত্রে সেই পণ্যটি ব্যবসায়িক ঝুঁকি এর মুখে পড়ে। লেবার খরচ বেড়ে যাওয়ার পিছনেও নানা রকম কারণ আছে।

যেমন পণ্যের কারখানা যেখানে অবস্থিত, হয়তোবা সেখানে পণ্যের উৎপাদনে জড়িত থাকবে তেমন স্কিলড লেবার কম আছে। সেক্ষেত্রে বাকি লেবারদের মজুরি বেশি থাকে। আবার কখনো দেখা যায় কোন আন্দোলনের কারণে হয়তো বা লেবার কস্টিং বেশি। এরকম নানা কারণে লেবারের খরচ বাড়তে থাকতে পারে।

কারখানার অবস্থানগত কারন

আরেকটি পয়েন্ট হলো কারখানার অবস্থান। অনেক সময় দেখা যায় আমদানি অথবা রপ্তানিযোগ্য পণ্যের কারখানা এমন কোথাও অবস্থিত যেখান থেকে পণ্যটিকে অন্য কোথাও পাঠাতে ট্রান্সপোর্টেশন খরচ অনেক বেশি থাকে। যেহেতু একটি পণ্যের মূল্যের সাথে ট্রান্সপোর্টেশন খরচ যোগ হয় ফলস্বরূপ মূল্য বেড়ে যেয়ে উৎপাদন রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক অবস্থা তৈরি করে।

ডলারের দাম বাড়ার সাথে কাঁচামাল আমদানী খরচ বৃদ্ধি

গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন, রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলারের বাড়তি মূল্য। ডলারের মূল্যের কারণে নানা রকম পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করার ক্ষেত্রে খরচ এতটাই বেড়েছে যে পন্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসাকে ফেলছে ব্যবসায়িক ঝুঁকি এর মুখে।

অতিরিক্ত বা কম উৎপাদন

অতিরিক্ত বা কম উৎপাদন দুটোই আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে বা প্রভাবিত করতে পারে। একটি পণ্যের উৎপাদন হওয়া উচিত সম্পূর্ণভাবে চাহিদা নির্ভর। অর্থাৎ যতটা চাহিদা থাকবে ততটা উৎপাদন করতে পারলেই কিন্তু ব্যবসায় লাভজনক হবে। কিন্তু নানা সময় দেখা যায় সঠিক পরিকল্পনার অভাবে কখনো চাহিদার চেয়ে কম বা বেশি উৎপাদন হয়েছে। বেশি উৎপাদন হলে যেমন অতিরিক্ত পণ্য নষ্ট হয়, অথবা কম মূল্যে অন্য কোথাও বিক্রি করে দিতে হয়, ঠিক সেভাবেই চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদন হলে সম্ভাব্য লাভ হওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়াসহ ক্রেতার সাথে সম্পর্ক ন্যস্ত হয়ে ব্যবসায়িক ঝুঁকি তৈরি হয়।

স্কিলড লেবারের সংকট

এটি এমন এক ঝুঁকি যা সরাসরি উৎপাদন এর সাথে সম্পর্কিত, তবে এটি পরোক্ষভাবে রপ্তানি ব্যবসাকে প্রভাবিত করতে পারে। স্কিলড লেবার এর ঘাটতি আপনার উৎপাদন এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আপনার কারখানা যদি রপ্তানিমুখী হয়ে থাকে তাহলে নির্ধারিত সময়ে বায়ার এর পন্য ডেলিভারি করার ক্ষেত্রে বিলম্ব হতে পারে, এমনকি আপনার বায়ার রপ্তানি আদেশ ও বাতিল করে দিতে পারে যেটা একটি মারাত্নক ব্যবসায়িক ঝুঁকি।

মুল কথা হল লেবার সংকট একটি লাভজনক ব্যবসায়কে অলাভজনক  ব্যবসায়ে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট।দক্ষ কর্মী, কোয়ালটি চেকার, প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান এর সংকটের কারণে উৎপাদিত পণ্যের গুনগত মান কমে যাওয়া বা নস্ট হওয়ার ফলে বিশেষত রপ্তানি ব্যবসায় বিবিধ ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

লেবার ধর্মঘটের ফলে বাধাগ্রস্ত উৎপাদন

বিশ্বের সবখানেই লেবার ধর্মঘট একটি কমন বিষয়। এই ধর্মঘটের ফলে যেটি হয় তা হলো মূলত উৎপাদন বাধা গ্রস্থ হওয়া। আর উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া মানে কিন্তু শুধু যে উৎপাদনই বন্ধ আছে তাই না, পাশাপাশি নানা ক্লায়েন্টের ডেডলাইন মিস করা থেকে শুরু করে অনেক সময় চুক্তি বাতিলের মতো ঘটনাও ঘটে।

তাই সাময়িক থেকে দীর্ঘকালীন নানা রকম ব্যবসায়িক ঝুঁকির মুখে পড়ে রপ্তানী ব্যবসা। অন্যদিকে দেখা গেল আপনি কারখানার জন্য কাঁচামাল আমদানি করে এনে ষ্টক করে রাখলেন কিন্তু লেবার ধর্মঘট এর কারনে সময়মত উৎপাদন শুরু হলনা, আপনার কাঁচামাল নষ্ট হল। এভাবে উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হওয়ার ফলে আমদানি রপ্তানি ব্যবসা প্রভাবিত হয়।

মেশিনারিজ জনিত সমস্যা

উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই নানা রকম ছোট বড় মেশিনারিজ প্রয়োজন পড়ে। এ ধরনের মেশিনারিজে টানা কাজ চলার ফলে নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। এবং আতঙ্কের ব্যাপার হল কোন একটি মেশিনারিজের সমস্যার কারণে পুরো প্রসেসের অন্যান্য ধাপেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ফলস্বরূপ দেখা যায় কখনো উৎপাদন বন্ধ থাকে। কখনো বা উৎপাদন ধীর গতিতে চলে। শুধু তাই নয় এ ধরনের বিশাল আকৃতির মেশিনারির ঠিক করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় তাও একটি ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতির কারণ। তাই এই মেশিনারিজ জনিত জটিলতা, অবশ্যই রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট

আধুনিক পৃথিবীতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে কমার্শিয়াল পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহার যেকোনো যুগের থেকে এখন বেশি। তাই দেখা যায় উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রায়ই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট চলে। যা উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্ন করে।

আরেকটি বিষয় এখানে না বললেই না, কমার্সিয়াল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিন্তু ইউনিট প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে খরচের মাত্রাও অনেক বেশি। এতে পন্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াসহ, সময়মত উৎপাদন শুরু করতে না পারা সহ বিভিন্ন কারনে আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ঝুঁকি তৈরি হয়।

সরকারের নীতির পরিবর্তন

সরকার নানান সময় নানান প্রয়োজনে ব্যবসা খাতে নানান রকম নীতি প্রণয়ন করে থাকে। এর কোনোটি যেমন ব্যবসায়ীদের জন্য সুখকর হয় কোনটি আবার তাদের ব্যবসায়কে ফেলে ঝুঁকির মুখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কর বৃদ্ধির কথা। স্বাভাবিকভাবেই কর বৃদ্ধি রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায়ের জন্য একটি বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি কারণ তা সামগ্রিক উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দেয়। অনেক দেশেই এই কর বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায় নানাবিধ  আশঙ্কার মুখে পড়েছে।

মালিকপক্ষের পুঁজি সংকট

অনেক সময় দেখা যায় মালিক পক্ষ যে পরিমাণ পুঁজির ক্যালকুলেশান করে ব্যবসায় নেমেছে প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে বেশি পুঁজি প্রয়োজন। অথবা সঠিক পরিমাণ পুঁজি নিয়ে নামার পরেও কিছু অতিরিক্ত পুঁজির প্রয়োজন পড়ছে।

এমন সময় মালিকপক্ষ যদি সেই পুঁজি সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে না পারে সে ক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসায়িক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাছাড়া এই পুঁজির সংকট চলতে থাকলে মালিকপক্ষ অনেক সময় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়, ফলে সেই লোন পরিশোধ করার চাপও ব্যবসায়ের উপর থাকে।

Similar Posts

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।